প্রসঙ্গঃ ডুব সিনেমা এবং ফারুকীর ভন্ডামি

কাউকে উল্লেখযোগ্য কোন তথ্য না জানিয়ে ডুবে ডুবে “ডুব” মুভি বানিয়ে অবশেষে মাথা তুলতে গিয়ে পুনরায় শাওনের চাপে ডুবে যাওয়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকির গত দুই দিনের কমেডি দেখলাম । সেসব দেখে নিজের কিছু চিন্তা এবং মতামত শেয়ার করতে ইচ্ছা হলো ।

ফারুকি কি নিয়ে মুভি বানাবেন, কিভাবে বানাবেন, সেটা একান্তই তার নিজের ব্যাপার । তবে মুভিটা যদি কোন ব্যক্তির জীবনের কোন ঘটনা নিয়ে হয়, তাহলে কমনসেন্সেই বলে যে, সেই ব্যক্তি বা পরিবার বা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমতি নেয়া আবশ্যক । ডুব ছবিটা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে নির্মিত, এটা পরিচালক সরাসরি সংবাদমাধ্যমে না বললেও পত্র পত্রিকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাক্ষাৎকার এবং ফারুকীর নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেই স্পষ্টভাবে এটার প্রমাণ পাওয়া যায় (সূত্রঃ ১ ; ছবিঃ ১,২,৩)। এসব তথ্য থেকে পরিস্কারভাবেই এটা জানা যায় যে, “ডুব” মুভিটা হুমায়ূন আহমেদের জীবনের ঘটনা নিয়ে নির্মিত যেখানে হুমায়ূন আহমেদের বাইরেও আছেন তার স্ত্রী শাওন, গুলতেকিন এবং তার মেয়ে শীলা (সূত্রঃ ১)।

ছবি ১ঃ ডুব সিনেমায় পার্নো মিত্রের চরিত্র সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য
ছবি ২ঃ ডুব ছবিতে হুমায়ূন আহমেদের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে ফারুকির নিজের বক্তব্য
ছবি ৩ঃ ডুব ছবিতে ইরফান খানের অভিনীত চরিত্র

কারও জীবনী নিয়ে যখন ছবি বানাতে হয়, হোক সেটা বিশুদ্ধ বায়োগ্রাফি বা বায়গ্রাফি এবং ফিকশনের মিশেল, তখন সেই ব্যক্তি সম্পর্কিত মানুষগুলোর সাথে কথা বলা লাগে । মুভি রয়্যালটির একটা অংশ তাদেরকে দিতে হয় অনুমতিপ্রদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ । কিন্তু সেটাই একমাত্র মূখ্য ব্যাপার না এখানে । তাদের জীবনটাকে জানাটাই বরং মূখ্য । আমি একটা ঘটনা যে পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে দেখছি, সংশ্লিষ্ট পরিবারের লোকজন সেই ঘটনা সম্পর্কে আমাকে আরও অনেক বেশি ভালোভাবে জানাতে পারবে, তাদের মতামত দিতে পারবে । একজন ভালো পরিচালক (অন্তত নীতিবান পরিচালক) এটা নির্দ্বিধায় খুশিমনে করবেন । কিন্তু মতামত না নিয়ে, এমনকি না জানিয়েই মুভি বানিয়ে পরে যখন পরিবারের একজন সেই মুভির ব্যাপারে আপত্তি জানালো, তখন তাকেই অপমানজনক কথা বলা? কতোটুকু নির্লজ্জ এবং নীতিহীন হলে এটা করা সম্ভব? শাওনের ব্যাপারে ফারুকির বক্তব্য হচ্ছে, “উনি ডুবের ব্যাপারে আপত্তি জানানোর কে?” (ছবিঃ ৪) । সিরিয়াসলি? শাওন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী । যদি কারও আপত্তি জানানোর অধিকার থাকে, শাওনের নাম তাদের মধ্যে প্রথমে আসবে । আবার পত্রিকা সাক্ষাৎকারে বললো, “শাওন কোনো ইস্যু না, ওই চ্যাপ্টার ক্লোজড” (সূত্রঃ ২) – এতোটা হীন একজন শিল্পী কিভাবে হয়? অনুমতি নেয়নি তো নেয়নি, আবার এভাবে কটাক্ষজনক কথা বলা !! একজন সিনিয়র শিল্পী যদি এভাবে পথ দেখিয়ে দেয়, তার অনুগামীরা শিখবে কি? কেউ চাইলে শাওন এর সাক্ষাৎকার টাও পড়ে নিতে পারেন সূত্রঃ ৩ থেকে ।

ছবি ৪ঃ শাওনের ব্যাপারে ফারুকির প্রতিক্রিয়া

ফারুকী বলছে, যদি মুভিতে লেখা থাকে যে, এটা বায়োপিক, সেই ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়ার প্রশ্ন আসে । কিন্তু এই মুভি আসলে ছোট ছোট কিছু ঘটনা নিয়ে নির্মিত, তাই এটাকে বায়োপিক বলা যায় না ! আসলেই কি তাই ফারুকী সাহেব? তার মানে, আমরা বুঝলাম যে, বায়োপিক হয়তে হলে একজনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমস্ত জীবন নিয়ে মুভি বানাতে হবে । জীবনের কোন খণ্ডাংশ নিয়ে বায়োপিক বানানো যাবে না? হে হে, আমাকে কি একটু বুঝাবেন, শিন্ডলার্স লিস্ট, দ্যা পিয়ানিস্ট, ইপ ম্যান (IP Man) এগুলা কি বায়োগ্রাফি মুভি না? এগুলাতে কি ফিকশন মেশানো হয় নাই? এগুলা কি তাদের পুরা জীবন নিয়ে নির্মিত নাকি জীবনের একটা নির্দিস্ট অংশ নিয়ে নির্মিত? তাই বলে কি এই মুভিগুলাতে ওই লোকগুলাকে স্মরণ করে নাই? নিজের ধাপ্পাবাজি চাপা দেয়ার জন্য আর কতোটা নিচে নামা যায়? আর এই সূত্রে তো বলতে হয়, ফারুকী সব দিক থেকেই অপরাধী ! ১) সে অনুমতি না নিয়েই হুমায়ূন আহমেদ এবং তার কাছের কিছু মানুষজনকে নিয়ে তাদের জীবনের কিছু ঘটনার উপর ভিত্তি করে মুভি বানিয়েছে, ২) তার মুভিতে সে এই তথ্যটুকুও উল্লেখ করার মতো ভদ্রতা দেখাচ্ছে না, ৩) সংশ্লিষ্ট পরিবার বা সদস্য তাদের প্রাপ্য রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে (এটা নাহয় বাদই দিলাম)

অতঃপর ফারুকী সাহেব আমাদেরকে গণতন্ত্র এবং বাক স্বাধীনতা নিয়ে কিছুটা জ্ঞান দিলেন (ছবিঃ ৫)! আহ লজ্জা, শেষ পর্যন্ত ফারুকীর কাছ থেকে আমাদেরকে বাক স্বাধীনতার ছবক নিতে হইলো । এই ফারুকীই লেখালেখি কারণে হত্যাকে বৈধতা দিয়ে গেছে দিনের পর দিন । বেশিরভাগ হত্যার ক্ষেত্রেই চুপ থেকেছে (যেমনটা সবাই থাকে), আর যখন মুখ খুলেছে, তখন উল্টো কটাক্ষ করেছে হত্যার শিকার মানুষগুলোকেই, মজা করেছে তাদের নিয়ে । আর এই লোকটাই আমাদেরকে দিচ্ছে বাক স্বাধীনতা সম্পর্কিত জ্ঞান !!

ছবি ৫ঃ বাক স্বাধীনতা সম্পর্কিত ফারুকির বয়ান

কতোটা নির্লজ্জ হলে মানুষ এইরকম ক্রমাগত মিথ্যাচার করে যেতে পারে, বেহায়াপণা করতে পারে, এটা আমার ধারণা বাইরে । এই মানুষগুলোই নাকি আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের রোল মডেল । এইসব ধ্বজভঙ্গ রোল মডেল লইয়া আমরা কি করিবো?

তথ্যসূত্রঃ
১) http://www.anandabazar.com/supplementary/anandaplus/irrfan-khan-in-a-shooting-of-a-novel-humayun-ahmed-in-bangladesh-1.507356
২) http://bangla.bdnews24.com/glitz/article1290724.bdnews
৩) http://bangla.bdnews24.com/glitz/article1290628.bdnews

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *