হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবসে এক টুকরো ভালোবাসা

আমার পড়ার শুরুটা কি হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে হয়েছিল? সম্ভবত না । আমার পড়ার অভ্যাসটা এসেছে কমিকস আর মাসুদ রানা পড়া থেকে । পাগলের মতো পড়তাম, কিনতাম, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতাম, আর এজন্য মাঝে মাঝেই রামধোলাইও খেতাম । সেটাই কালক্রমে অন্য বই পড়ায় উৎসাহ দিয়েছে । আর এই অন্য বই পড়তে পড়তে পড়াটাই অভ্যাস হয়ে যাওয়াটা? হুম, সেটা হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরেই ।
 
হুমায়ূন আহমেদের লেখার মধ্যে একটা সারল্য আছে । পড়তে গিয়ে নিজেকে খুব সহজেই বসিয়ে ফেলা যায় গল্পের চরিত্রের জায়গায় । মনে হয় যেন, “আরে, আমিও এই পরিস্থিতিতে পড়ছিলাম” বা “আমিও এমন করতে পারলে কি চমৎকারই না হতো!” । এটাই তার লেখার শক্তি । কেমন যেন আপন মনে হয়, খারাপ বা বিরক্ত লাগে না । মন ভালো? তার বই পড়ি । মন খারাপ? তার বই পড়ি । কিছু করার নেই? কি পড়বো বুঝতে পারছি না? বসে পড়লাম তার একটা বই নিয়ে ।
 
তার সম্পর্কে খুব প্রচলিত একটা কথা হল, হুমায়ূন আহমেদ বাজারি লেখক । তো? উনি নিজেও তো এটা অস্বীকার করেন নাই যে, উনার বেশিরভাগ লেখা প্রকাশকদের আবাদার মেটাতে লেখা হয় । আর, উনি বাজারি লেখা লিখলে সমস্যাটা কি? তার লেখা পড়ে কোন চিন্তা ভাবনার কিছু নাই । তাতে কি হয়েছে? বই কি এমন হওয়া বাধ্যতামূলক যে, সেই বই পড়ে আপনাকে রাজ্যের চিন্তা মাথায় নিয়ে বসে পড়তে হবে? বই পড়ার পর সেটার বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা করে মাথা ব্যাথা করে ফেলতে পারলেই সেটা ক্ল্যাসিক? না জনাব, আপনার সাথে ঘোরতর আপত্তি পোষণ করছি । সবাই যে আহমদ ছফা, হুমায়ুন আজাদের মতো সমাজ সভ্যতা নিয়ে লিখতে হবে তা না, বা সুনীল সমরেশের মতো গম্ভীর ভাষায় এপিক উপন্যাস রচনা করতে হবে তাও না । তাদের মধ্যে তুলনা করাটাও আমার কাছে বোকামিই মনে হয় । এরা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার লেখক এবং তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের লেখনী অত্যন্ত শক্তিশালী । তুলনা কিভাবে হয়? আপনি একটা আপেলের সাথে আরেকটা আপেলের তুলনা দিতে পারেন । কিন্তু একটা আপেল আর একটা কমলার মধ্যে যদি বলেন যে, “বল, কোনটা ভালো” তাহলে তো হয় না । তার প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ জায়গায় অসাধারণ । হুমায়ূন আহমেদ যেমন আহমদ ছফার মতো করে লিখতে পারবেন না, তেমনি আহমদ ছফারও সামর্থ্য নেই হুমায়ূন আহমেদের মতো এতোটা সাবলীলভাবে কোন ঘটনাকে লেখায় ফুটিয়ে তোলার ।
 
আমার ভাই হুমায়ূন আহমেদের বিশাল ভক্ত । হুমায়ূন আহমেদের সম্ভবত এমন কোন বই নাই যেটা তার পড়া হয় নাই । বুকশেলফ এর একটা পার্ট শুধু তার জন্যই বরাদ্ধ । তার কিছু কাজ কর্ম দেখে মাঝে মাঝেই মনে হয়, সে হিমুর মতো হওয়ার চেষ্টা করছে । এটা ভালো নাকি খারাপ সেটা ভিন্ন তর্ক, কিন্তু এটা বলতে চাইছি যে, তার জীবনে হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব ব্যাপক । গত বেশ কয়েক বছর যাবৎ দেখছি সে সুনীল, সমরেশ, শার্লক হোমস সহ অন্যান্য বইগুলাও পড়া শুরু করছে । মাঝে মাঝেই কোন একটা বই নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “ভাইয়া, এই বই কেমন? পড়ি?” । আমার ভালো লাগে । চোখের সামনেই দেখতে পাই আরেকজন পাঠকের সৃষ্টি । এই পাঠকটাকে তৈরি করেছিল কে? সেই কৃতিত্ব কিন্তু হুমায়ূন আহমেদেরই প্রাপ্য ।
 
হুম, আমাদের দেশের যে পাঠক সমাজ সেটা সৃষ্টির পেছনে বিশাল অবদান কিন্তু এই হুমায়ূন আহমেদ এবং কাজী আনোয়ার হোসেন (মাসুদ রানা) দের মতো “বাজারি লেখক”দের । এরা না থাকলে এই মানুষগুলার পাঠাভ্যাসই গড়ে উঠতো না । একটা জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষের পড়ার শুরু হয় হালকা চালে লেখা বই দিয়েই, দস্তয়ভস্কি দিয়ে না ।
 
আমার মতো অসংখ্য মানুষের পাঠাভ্যাস গড়ে দেয়া এই হুমায়ূন আহমেদকে তার প্রয়াণ দিবসে মন থেকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা, আর তার পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য শুভকামনা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *