৫৭ ধারার অপব্যবহার এবং একটি ছেলেভুলানো গল্প

অনুভূতির আইন সম্পর্কিত বিভিন্ন আইন অনেক আগে থেকে থাকলেও বাংলাদেশে ৫৭ ধারার প্রাতিষ্ঠানিক শুরু ২০০৬ সালে । নিজেদের ক্ষমতার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বিএনপি সরকার সংবিধানে এই আইন যুক্ত করে ৮ অক্টোবর ২০০৬ এ (সূত্রঃ ১)। মনে রাখা প্রয়োজন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল সেই বছরেরই ২৯ অক্টোবর ।
এরপর অনেক সময় গত হয়েছে, কিন্তু আইনটা আইনের বইয়েই থেকে গিয়েছিল । এর প্রথম প্রয়োগ হয়েছিল ২০১৩ এর শাহবাগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর । সাল দেখে বুঝতেই পারছেন, ধর্মীয় ইস্যুকে উপজীব্য করে রাজাকারদের বিচারের আন্দোলনকে প্রভাবিত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য । সেই শুরু, এরপর এই আইন সময়ের সাথে হয়ে উঠেছে বিভীষিকা । ২০০৬ থেকে ২০১৩ এই ৭ বছরে এই আইনে মামলা ছিল মোটে ২ টা (সূত্রঃ ২; আরও মামলা হয়ে থাকতে পারে, আমার জানা নাই) । ২০১৩ তে ৩ টি মামলা দায়েরের মাধ্যমে এই আইনের প্রয়োগ শুরু হল (সূত্রঃ ৩)। পরের বছর ২০১৪ তে মামলার সংখ্যা এক লাফে পৌঁছালো ৩৩ এ । এরপর প্রতিবছর গুণোত্তর ধারায় বেড়ে ২০১৭ এ এই জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসেই মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৯ এ ! বেশ কিছুদিন আগে পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম (সূত্রঃ ৪)। সেটার সাথে কোন মিল খুঁজে পাচ্ছেন?
ছবি ১ঃ বছর অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলার সংখ্যা
শুরুতে এই আইনে মামলা হতো শুধুমাত্র ধর্মীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে । কিন্তু সেটা ছিল কেবল শুরু । শুরুতেতো আর একলাফে গাছে উঠে যাওয়া যায় না, তাই মানুষকে অভ্যস্ত করে নেয়ার জন্য সেটা ধর্মীয় ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ ছিল । সময় যতো গড়িয়েছে, এই আইনের অপব্যবহারও বেড়েছে সমান হারে । অপব্যবহার? সেটা কিভাবে? সবাইতো আইন মেনেই অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মামলা করেছে । কিন্তু সেই অনুভূতিটা প্রথম দিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক সব কিছুতেই । প্রশ্নটা যখন অনুভূতির, তখনতো সেটাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে বেঁধে রাখাটা কঠিন । সেই স্বাভাবিক ব্যাপারটা এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এমন অনেককেও যারা হয়তো আগে এই আইনের সমর্থনেই কথা বলেছিল । কে বাদ থাকছে এখন? ধর্মীয় ইস্যুতে সাধারণ মানুষকে হয়রানিতো আছেই, এর সাথে এখন ভিক্টিম হিসেবে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, সরকারী কর্মচারী এমনকি মন্ত্রী আমলাও । এটা এমনই এক আইন যেখানে একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকলে সেটাতেও অনুভূতি আহত নিহত হয়ে যায় (সূত্রঃ ৫)
বেশ কিছুদিন আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি ৫৭ ধারা বাতিল করবেন । অনেকে দেখলাম এই খবরে বেশ খুশিও হয়েছেন । কিন্তু আইনমন্ত্রী যেটা চেপে গিয়েছেন তা হল, ৫৭ ধারার পরিবর্তে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে অন্য একটা আইন তারা প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন যেটা আরও জঘন্য। শাস্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দুইটারই সুযোগ যেখানে আরও বেশি (সূত্রঃ ৫, ৭, ৮) (ছবিঃ ২)। এই আইনটা সম্ভবত তারা প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন আগামী আগস্ট এ । এ যেন ছেলেখেলার মতো হয়ে গেলো । কথা দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজদের স্বার্থ ঠিক রেখেই কর্মোদ্ধার করে নেয়া !
ছবি ২ঃ নতুন প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ফাঁকফোকর
৫৭ ধারা নামের এই কালো আইন প্রণীত হয়েছিল বিএনপি আমলে । এর ব্যবহার শুরু হল আওয়ামী লীগ আমলে এসে । রেহাই পেলো না কেউই । মাননীয় বর্তমান সরকার, আপনারাও এক সময় ক্ষমতা থেকে সরবেন । তখন এই আইন কিন্তু আপনাদেরও ছেড়ে কথা বলবে না । সময় থাকতেই এই কালো আইন কোন প্রতিস্থাপন ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে বাতিলের ব্যবস্থা করুন । একটা কথা আছে, হাতি গর্তে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে । ৫৭ ধারাটা কিন্তু সেই রকমই একটা অতল গর্ত, তবে অদৃশ্য । কে কবে কিভাবে এই গর্তে পড়বে আর কে সুবিধা নিবে সেটা বলার কোন উপায় নাই ।
তথ্যসূত্রঃ

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *