বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং তার বিচার সম্পর্কে আপনি কতোটুকু জানেন?

আগামীকাল বঙ্গবন্ধুর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী । জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর হত্যা এবং বিচার সম্পর্কিত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার ইচ্ছায় একটা কুইজ বানালাম । কুইজের শেষে উত্তরগুলো যথাসম্ভব বিস্তারিত দেয়ার চেষ্টা করেছি । আপনাদের যদি ভালো লাগে এবং নতুন কিছু আপনাদের জানার ভাণ্ডারে যোগ হয়, তাহলেই আমার এই প্রচেষ্টা সফল বলে ধরে নিবো ।

#1 বঙ্গবন্ধুকে কত বছর বয়সে হত্যা করা হয়?

বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন ১৭ মার্চ ১৯২০ সালে, গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় । মৃত্যু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ধানমন্ডী ৩২ নং রোডের বাড়িতে

#2 সেদিন মোট কতজনকে হত্যা করা হয়?

নিহতরা হলেনঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক । প্রায় একই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি কে এবং বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করা হয়

#3 হত্যাকান্ডের বিচার ঠেকাতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় কবে?

সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের ঘটানো এই হত্যাকান্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করা হয় । অর্থাৎ মোশতাক ছিল সেনা সমর্থিত সরকারের নিযুক্ত একজন রাষ্ট্রপতি । উল্লেখ্য, এই সময় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জিয়াউর রহমান যিনি সেনা প্রধান নিযুক্ত হন ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ এ, বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মাত্র ৯ দিন পর । এর এক মাস পর, ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ এ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইন জারি করা হয় যার মাধ্যমে উক্ত হত্যাকান্ডের বিচার রহিত করা হয়

#4 হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ১২ জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকুরি দেওয়া হয় কবে?

সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর সাথে আরও কিছু ঘটনা মেলালে হত্যাকান্ডে কাদের পরোক্ষ সহায়তা বা সমর্থন ছিল সেটা পরিস্কার হয়ে যায় । ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসাবে আবিভূর্ত হন। সে সময় বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। এর ২ মাস পরেই হত্যাকারীদেরকে দেশের বাইরে বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ দেয়া হয় । ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং জিয়া রাষ্ট্রপতি হন।

নিয়োগপ্রাপ্ত বারোজন হলোঃ
১. লে. কর্নেল শরিফুল হক (ডালিম), চীনে প্রথম সচিব
২. লে. কর্নেল আজিজ পাশা, আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব
৩. মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব
৪. মেজর বজলুল হুদা, পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব
৫. মেজর শাহরিয়ার রশিদ, ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব
৬. মেজর রাশেদ চৌধুরী, সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব
৭. মেজর নূর চৌধুরী, ইরানে দ্বিতীয় সচিব
৮. মেজর শরিফুল হোসেন, কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব
৯. কর্নেল কিসমত হাশেম, আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব
১০. লে. খায়রুজ্জামান, মিসরে তৃতীয় সচিব
১১. লে. নাজমুল হোসেন, কানাডায় তৃতীয় সচিব
১২. লে. আবদুল মাজেদ, সেনেগালে তৃতীয় সচিব

#5 ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়া হয় কোন সরকারের আমলে?

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

একটু লক্ষ করুন, মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে ব্যবস্থা না নিতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিলেন এবং ঐ সময়ে একটি প্রপাগন্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তন হবে না। এবং এই দোহাই দিয়েই জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। যা জাতি হিসাবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

#6 ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয় কবে?

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করা হয়, তাদের রিপোর্টেই প্রকাশ পায় এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এরপর তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য ‘দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন এবং এটি পাস হয় ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ।

#7 বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়েছিল কতো সালে?

১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর খুনীদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল এবং ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেটাকে পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত করার মাধ্যমে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অতঃপর, ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশীট দাখিল করা এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডি ।

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ নানা বাধার কারণে আটবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। আদালতে ৬১ জনের সাক্ষ্য প্রধান সহ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মোট ৪৫০ জনকে । এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন।

#8 বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার রায় প্রথম প্রকাশিত হয় কতো সালে?

১৯৯৮ সালে ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ঘটনায় ঢাকার দায়রা জজ গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় প্রকাশ করেন । আপিল নিষ্পত্তির পর ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর এই মামলায় বিভক্ত রায় আসে বিচারপতিদের কাছ থেকে । বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অন্য বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ আসামির ফাঁসির আদেশই বহাল রাখেন।

#9 চূড়ান্ত রায়ে কতজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়?

২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই বারো জন আসামী হলোঃ

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, রাশেদ চৌধুরী, নূর চৌধুরী, মেজর শরিফুল হক ডালিম, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ, রিসালদার মোসলেহউদ্দীন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দীন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক রহমান, মেজর বজলুল হুদা, মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজ পাশা

#10 এখন পর্যন্ত কতোজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে?

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডের রায় আংশিক কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে। সে রাতে খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়। আজিজ পাশা মারা যায় ২০০২ সালে, জিম্বাবুয়েতে । বাকি ছয়জন এখনো পলাতক বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছে বিভিন্ন দেশে ।

#11 ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয় কতো সালে?

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টকে শোক দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হলেও ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটা বাতিল করে দেয় । এরপর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২৭ জুলাই-২০০৮ এ হাই কোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ও সরকারি ছুটি বহাল রাখার পক্ষে রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সাল থেকে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

জমা দিন

Results

আপনি একজন প্রচন্ড ইতিহাস সচেতন মানুষ । আপনার জন্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং শুভকামনা

দেশের ইতিহাস সম্পর্কে আপনার আগ্রহ উৎসাহব্যাঞ্জক । শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং শুভকামনা আপনার জন্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *