শেখ কামালকে নিয়ে প্রচলিত দুটি অপপ্রচারের খণ্ডনচেষ্টা

বঙ্গবন্ধুর পরিবার নিয়ে যে দুইটা অপপ্রচার সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সে দুইটা হলো মেজর ডালিমের বউকে অপহরণ এবং শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতি সম্পর্কিত ঘটনা । দুইটা ঘটনাই রেফারেন্স সহকারে খন্ডন করার চেষ্টা করি ।
 
১) মেজর ডালিমের বউকে অপহরণ সংক্রান্ত ঘটনাঃ
 
এই সম্পর্কিত ঘটনার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হতে পারে মেজর ডালিমের নিজের ভাষ্য। সে নিজে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করছে, সে হিসাবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বা বিপক্ষে বলা তার কথার ক্রেডিবিলিটি এমনিতেও খুব কম, তার উপর নিজের এবং নিজের বৌ এর সাথে ঘটা ঘটনাতে তো বঙ্গবন্ধু আর তার পরিবারের কেউ জড়িত থাকলে সেটা উল্টা আরও বাড়ায়ে বলার কথা, তাই না? বস্তুত, এই ঘটনা সম্পর্কে তার নিজের ভাষ্যেই শেখ কামাল নাই, আছে গোলাম মোস্তফা নামের আরেকজন । মেজর ডালিমের লেখা “যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি” বই থেকে কিছুটা কোট করে দিচ্ছিঃ
 
“হঠাৎ দু’টো মাইক্রোবাস এবং একটা কার এসে ঢুকল লেডিস ক্লাবে। কার থেকে নামলেন স্বয়ং গাজী গোলাম মোস্তফা আর মাইক্রোবাস দু’টো থেকে নামল প্রায় ১০-১২ জন অস্ত্রধারী বেসামরিক ব্যক্তি। গাড়ি থেকেই প্রায় চিৎকার করতে করতে বেরুলেন গাজী গোলাম মোস্তফা।
 
-কোথায় মেজর ডালিম? বেশি বার বেড়েছে। তাকে আজ আমি শায়েস্তা করব। কোথায় সে? আমি তখন ভেতরে সবার সাথে খাচ্ছিলাম। কে যেন এসে বলল গাজী এসেছে। আমাকে তিনি খুঁজছেন। হঠাৎ করে গাজী এসেছেন কি ব্যাপার? ভাবলাম বোধ হয় তার পরিবারকে নিয়ে যেতে এসেছেন তিনি। আমি তাকে অর্ভ্যথনা করার জন্য বাইরে এলাম। বারান্দায় আসতেই ৬-৭জন স্টেনগানধারী আমার বুকে-পিঠে-মাথায় তাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে ঘিরে দাড়াল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিতো হতবাক! কিছুটা অপ্রস্তুতও বটে। সামনে এসে দাড়ালেন স্বয়ং গাজী।”
 
আর এই ঘটনার বঙ্গবন্ধুর প্রতিক্রিয়া কি ছিল? সেটাও মেজর ডালিমের লেখা বই থেকেই কোট করা যাকঃ
 
“গাজীকে উদ্দেশ্য করে গর্জে উঠলেন শেখ মুজিব। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নিম্মী এবং আমাকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। খালাম্মা ঠিকমত হাটতে পারছিলেন না। কামাল, রেহানা ওরা সবাই ধরাধরি করে ওদের উপরে নিয়ে গেল। শেখ সাহেবের কামরায় তখন আমি, নিম্মী আর গাজী ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। নিম্মী দুঃখে-গ্ল্যানিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। শেখ সাহেব ওকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিতে চেষ্টা করছিলেন। অদূরে গাজী ভেজা বেড়ালের মত কুকড়ে দাড়িয়ে কাঁপছিল। ………..
 
আমি অনেক চেষ্টা করেও সেদিন নিম্মীকে শান্ত করতে পারিনি। ঠান্ডা মেজাজের কোমল প্রকৃতির নিম্মীর মধ্যেও যে এধরণের আগুন লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা আমার কাছেও আশ্চর্য লেগেছিল সেদিন। শেখ সাহেব নিম্মীর কথা শুনে ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলেছিলেন,
-মা তুই শান্ত ’হ। হাসিনা-রেহানার মত তুইও আমার মেয়েই। আমি নিশ্চয়ই এর উপযুক্ত বিচার করব। অন্যায়! ভীষণ অন্যায় করছে গাজী কিন্তু তুই মা শান্ত ’হ। বলেই রেহানাকে ডেকে তিনি নিম্মীকে উপরে নিয়ে যেতে বললেন।”
 
মেজর ডালিমের বইয়ের অনলাইন ভার্সনের লিঙ্কঃ যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি
 
মেজর ডালিমের নিজের বৌ এবং নিজের সম্পর্কে তার নিজের ভাষ্যকেও কি অপপ্রচার বলবেন?
.
 
২) ব্যাংক ডাকাতি সংক্রান্ত অপপ্রচারঃ
 
এই ঘটনার ব্যাপারে উল্লেখ করবো মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরি(বীর বিক্রম) এর লেখা “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক” বই এর কথা । উনি বইয়ের ৬৫-৬৬ পৃষ্ঠায় বলেছেনঃ
 
তখন সর্বহারা পার্টি খুব সক্রিয় ছিল ঢাকায় এবং তাদেরকে ধরতে পুলিশ বাহিনীও ছিল খুব তৎপর । এইরকম একদিন শেখ কামাল তার সাত বন্ধুকে নিয়ে একটা মাইক্রোবাসে করে শহরে ঘুরতে বের হয় । শহরে টহলরত পুলিশের একটা জিপ মাইক্রোবাসটাকে তাদের পেছনে দেখে সর্বহারাদের জীপ মনে করে হঠাৎ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গুলি চালায় । ফলে শেখ কামালসহ তারা সাতজনই আহত হয় । পরে পুলিশই তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যায় ।
 
ঘটনা শোনার পর বঙ্গবন্ধু প্রথমে হাসপাতালে শেখ কামালকে দেখতেই যেতে চাননি, কারণ এতো রাতে উল্টা পাল্টা ঘোরাফেরায় তিনি তার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন । পরে অবশ্য গিয়েছিলেন । এই রকম একটা ঘটনাকে উল্টা প্রচার করা হয় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা হিসেবে । সেই ব্যাংক ডাকাতির টাকা তাদের মৃত্যুর পর কোথায় গিয়েছিল সেই প্রশ্ন কেউ তোলে না
এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক পৃষ্ঠা ৬৫

 

এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক পৃষ্ঠা ৬৬
 
বইটা আপনারাও চাইলে ডাউনলোড করে পড়তে পারেন এখান থেকেঃ এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক
 
একজন মানুষ, যার কাছে একটা দেশের প্রতিটা মানুষের আজন্ম কৃতজ্ঞ থাকার কথা, তেমন মানুষের নিজের দেশের কারও দ্বারাই হত্যার শিকার হওয়া কোন নতুন ঘটনা না । কিন্তু, সে মানুষকে হত্যার সাথে সাথে তার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, তার ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা, উল্টো ভুয়া ইতিহাস বানিয়ে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা, এমন কি আর কারও ক্ষেত্রে হয়েছে? কখনো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *