কিভাবে যাচাই করবেন কোন তথ্য বা ছবি?

ইন্টারনেটের কল্যানে যেকোনো কিছু সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেমন অনেক সহজ হয়ে গেছে, তেমনি আপনার অজ্ঞতা বা অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে যেকোনো ব্যাপারে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোও অনেক সহজ হয়ে গেছে । কিন্তু, ভুল তথ্য বা ভুয়া ছবির এই ব্যাপারটা এড়ানো যায় খুব সহজেই, শুধুমাত্র গুগল ব্যবহার করেই । কিভাবে? বলার চেষ্টা করি ।

১) ভুল তথ্য বা সংবাদঃ

কোন তথ্য ভুল বা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে? হেডলাইনটা বা কিছু কিওয়ার্ড লিখে গুগলে সার্চ দিন । আশা করা যায়, গুগল সার্চের প্রথম পৃষ্ঠাতেই পেয়ে যাবেন আপনার উত্তর । যে সাইটগুলার পাঠকপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য, সেগুলোকে ফলো করার চেষ্টা করবেন । যেমনঃ চাঁদে অবতরণের ব্যাপারটা সম্পর্কে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করে বিভিন্ন কারণে । আপনারও যদি তেমন সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে গুগলে সার্চ দিতে পারেন এই লিখেঃ moon landing hoax . দেখতেই পারছেন, আমি কোন প্রশ্নও লিখি নাই, জাস্ট “চাঁদে অবতরণ ভুয়া” এই কিওয়ার্ডগুলা লিখছি । প্রথম ছবিতে দ্বিতীয় লিঙ্কেই দেখুন এক্সপ্রেস নামক একটি পত্রিকার লিঙ্ক এসেছে যেখানে এটাকে ভুয়া বলা হয়েছে বিভিন্ন কারণে এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, স্পেস.কম এর মতো নির্ভরযোগ্য সাইটেরও এই সম্পর্কিত লিঙ্ক চলে এসেছে যেখানে চাঁদে অবতরণ সংক্রান্ত সন্দেহমূলক প্রশ্নগুলোকে খণ্ডন করা হয়েছে । সেগুলো পড়ে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আপনার জানা তথ্যটি ঠিক নাকি ভুল ।

সংযুক্তিঃ চাঁদে এখন পর্যন্ত মানুষ ৬ বার গেছে, ২ জন করে মোট ১২ জন মানুষ চাঁদে নেমেছে । এর বাইরে আরও ৪ চার বার মনুষ্যবাহী যানে করে চাঁদের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করা হয়েছে এবং মনুষ্যবিহীন রোবোটিক মিশন গেছে অসংখ্যবার । এতো কিছুর পরেও প্রথম চন্দ্রাভিযান নিয়ে এতো সন্দেহ ছড়ানো হয় কারণ সে সময় আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা চলছিল কে আগে চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারে সেটা নিয়ে ।

 

ছবিঃ ১

 

কোন পত্রিকায় বা ফেসবুকে দেখা সংবাদ ভুয়া মনে হচ্ছে? উপরের মতো একইভাবেই হেডিংটা লিখে গুগলে সার্চ দিলেই সেই সম্পর্কিত তথ্য চলে আসবে । সেখান থেকে ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটা যাচাই বাছাই করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তথ্যটি সঠিক নাকি ভুয়া । যেমন ধরুন, কিছুদিন আগে পত্রিকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নোবেল মনোনয়ন বিষয়ক খবর ছাপা হয় । অথচ, সেটা নিয়ে গুগলে সার্চ দেয়ার পর একেবারে প্রথমেই আসে নোবেল কমিটির নিজস্ব সাইটের লিঙ্ক(যেটা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য), যেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্যেই (ছবিঃ ২, ৩) দেখা যায় যে, নোবেল কমিটি কখনোই মনোনয়নপ্রাপ্তদের তালিকা সাথে সাথে প্রকাশ করে না । অর্থাৎ, সংবাদটি ভুয়া ।

 

ছবিঃ ২

 

ছবিঃ ৩

 

২) ভুল ছবিঃ

ইন্টারনেটে ভুয়া তথ্য ভাইরাল করা খুব সহজ । কিছুটা আবেগী ধরণের ছবি এবং সেটা যদি মানুষের ভালো লাগা কোন ব্যাপার হয়, তাহলেই সেটা ভাইরাল হতে আর সময় নেয় না । সেই ক্ষেত্রে ছবিটা সেইভ করুন, এরপর নিচের ছবির মতো করে google.com.bd তে গিয়ে সেখান থেকে উপরের কোনার “ছবি” বাটনে ক্লিক করে অথবা সরাসরি images.google.com এ গিয়ে ছবিতে চিহ্নিত ক্যামেরায় ক্লিক করে আপনার ছবিটি আপলোড করে দিন (ছবিঃ ৪,৫,৬)।

 

ছবিঃ ৪

 

ছবিঃ ৫

 

ছবিঃ ৬

 

এরপর প্রাপ্ত লিঙ্কগুলোর তারিখ এবং সাথে অল্প করে দেয়া বর্ণনাটুকু দেখুন । ছবিটি সঠিক তথ্য দিচ্ছে নাকি ভুল, সেটা বুঝতে পারবেন নিজেই । যেমন ধরুন, ৭ এবং ৯ নং ছবিসহ আরও বেশ কিছু ছবি কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ছবি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে । কিন্তু, গুগলে ছবিগুলা দিয়ে সার্চ দিলে একেবারে প্রথম পেইজের প্রাপ্ত লিঙ্কই(ছবিঃ ৮) বলে দেয়, ৭ নং ছবিটা আসলে ২০১০ সালে চায়নাতে হওয়া একটা ভুমিকম্পে মৃতদের এবং তাদেরকে সাহায্যকারী মঙ্কদের ছবি, এবং ৯ নং ছবিটা নেপালী একটা মুভির দৃশ্য (ছবিঃ ১০) ।

 

ছবিঃ ৭

 

ছবিঃ ৮
ছবিঃ ৯

 

ছবিঃ ১০

 

আরেকটা ব্যাপার, যেকোনো তথ্য বা ছবি বাংলাদেশের গুগল ডোমেইনে না খুঁজে আন্তর্জাতিক ডোমেইনে খোঁজা উচিৎ । কারণ, বাংলাদেশের ডোমেইন দিয়ে খুঁজলে সেটা বাংলাদেশে ভাইরাল হওয়া খবর গুলোকেই হাইলাইট করবে, ফলে সঠিক তথ্য খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে । যেমন ধরুন, আগের ছবিটাই আমি যদি images.google.com এ না দিয়ে images.google.com.bd তে দেই বা google.com.bd থেকে “ছবি”তে গিয়ে দেই, সেই ক্ষেত্রে তথ্যটি পাওয়াই যায় না, ১১ নং ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে যে, ভুমিকম্প সম্পর্কিত খবরটিই প্রথম পৃষ্ঠায় নাই। কারণ বাংলাদেশে এই ভুয়া তথ্যটি এতোটা বারংবার ব্যবহৃত হয়েছে যে, সেগুলোর চাপে মূল তথ্যটি হারিয়েই গেছে পেছনের কোন এক পেজে ।

 

ছবিঃ ১১

 

গুগল সবসময় ট্রেন্ডিং লিঙ্কগুলো প্রথমে দেখায় । অর্থাৎ, যে লিঙ্ক যতো বেশি মানুষ দেখি, সে লিঙ্ক তত সামনের পেইজে আসবে । যদি আপনার যাচাই করতে চাওয়া তথ্য বা ছবিটি অত্যাধিক ভাইরাল হয়ে থাকে বা অতিরিক্ত রকম ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে প্রথম পৃষ্ঠায় সেটার সত্যিকারের সোর্সের লিঙ্ক নাও পেতে পারেন । তাই, অন্তত ২ বা ৩ নাম্বার পৃষ্ঠা পর্যন্ত গিয়ে দেখবেন । এছাড়া কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা ভুয়া খবর বা ছবি সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করে থাকে । তেমন কিছু সাইট হচ্ছেঃ বিদেশে “http://www.snopes.com” এবং বাংলাদেশে “https://www.jaachai.com” । এই সাইটগুলোতেও চাইলে ঢু মারতে পারেন মাঝে মাঝে । খুবই বুদ্ধিমান কেউ প্রোপাগান্ডা ছড়াতে গেলে হয়তোবা এতো কিছু করেও কোন খবর ভুয়া নাকি সঠিক সেটা বের করা কঠিন হয়ে পড়ে, তবুও এই ব্যাপারগুলো ফলো করলে অন্তত ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া তথ্য বা ছবি সনাক্ত করতে সমর্থ হবেন আপনি ।

সর্বোপরি সবচেয়ে উত্তম ফ্যাক্ট চেকিং প্লেস হচ্ছে আমার মস্তিস্ক । কাঁচা হাতে ফটোশপ করা পাতিলের মধ্যে সেদ্ধ হওয়া একটা মহিলার ছবি বা হাতি, ঘোড়ার মাথাওয়ালা মানুষের ছবিকে আপনার যদি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তাহলে গুগল কেন, আমার নিজেরও সাধ্য নাই আপনাকে বোঝানো ।

 

কোন সন্দেহ আছে?

 

শুভকামনা সবাইকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *