“ব্লু হোয়েল” সংশ্লিষ্ট গুজব এবং কিছু তথ্যাবলী

প্রথমেই সংবাদ শিরোনাম(স্পয়লার): যদিও “ব্লু হোয়েল” নামে কিছু একটা ছিল এবং সেটার সাথে কিছু ছেলে-মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা সম্পর্কিত, কিন্তু, এটাও সত্যি যে, “ব্লু হোয়েল” কোন গেইমই না, এটাতে ঢুকতে ডার্ক ওয়েব লাগে না, এটা শুরু করলে ফিরে আসা যাবে না এমন কিছু নেই এবং সর্বোপরি এই গেইমের ক্রিয়েটর আপনাকে ফলো করে না, করতে পারে না, তথ্য হাতিয়ে নেয় না, নেয়ার সম্ভাবনা নেই । মানুষ সব সময়ই কন্সপাইরেসি থিওরি পছন্দ করে, গুজব বিশ্বাস করতে ভালোবাসে । এটাও সেই লিস্টে নতুন এবং প্রচন্ড ক্ষতিকর একটা সংযোজন ।

 

এবারে বিস্তারিতঃ

১) ব্লু হোয়েল গেম নামে কিছু কি আসলেই আছে?

উত্তরঃ হুম আছে, তবে সেই ব্লু হোয়েল আর আমাদের আলোচিত ব্লু হোয়েল এক না । Blue Whale VR নামক একটা গেম আছে যেটা মূলত অগম্যান্টেড রিয়েলিটি বেইজড একটা শিক্ষামূলক গেম যার মাধ্যমে নীল তিমির অনেক তথ্য মানুষ শিখতে পারে । সেটাকে অনেকেই বিতর্কিত ব্লু হোয়েল ভেবে নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে ! বেচারা এপ্লিকেশন মালিক ! আরেকজনের দোষের কোপ পড়লো তার উপর ।

 

Blue Whale VR গেমের রিভিউ

 

২) আমাদের আলোচিত ব্লু হোয়েল কি কোন গেম?

উত্তরঃ না, এটা কোন গেম না । বরং এটা ৫০ টি কাজের একটা লিস্ট, যেটা পঞ্চাশ দিনে করতে হয় এবং প্রতিটা ধাপ গেমের এডমিন দ্বারা সত্যায়িত করতে হয় বলে একটা রিউমার প্রচলিত আছে, যদিও এটার কোন সত্যতা নেই । লিস্টটি নিচে দেখতে পাবেন, তবে, যেহেতু ছড়ানোর উদ্দেশ্য নেই, তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই লিস্টটি কিছুটা ব্লার করে দিয়েছি । কোন একজন এই লিস্টটাকেই এপ্লিকেশন বানিয়ে প্লে-স্টোরে আপলোড করে দিয়েছিল । গুগল কর্তৃপক্ষ সেটাও সরিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই ।

 

ব্লু হোয়েল এর ৫০ চ্যালেঞ্জ এর লিস্ট (ব্লারকৃত)

 

৩) এটার নাম ব্লু হোয়েল কেন?

উত্তরঃ কিছু তিমি মাঝে মাঝে সমুদ্র তটে উঠে পড়ে এবং মারা যায় । এটাকে অনেকে আত্মহত্যা বলে থাকে । এখান থেকেই ব্লু হোয়েল নামটার উৎপত্তি । কারণ, আত্মহত্যাকারীরাও নিজ ইচ্চাতেই মারা যায় ।

 

৪) এটির উৎস কি? মানে, এই চ্যালেঞ্জের উৎপত্তি কিভাবে?

উত্তরঃ এটার শুরু vk.com নামক একটা সাইট থেকে, যেটা আমাদের পরিচিত ফেসবুকের মতোই রাশিয়ার খুব জনপ্রিয় একটা সামাজিক ওয়েবসাইট । ফেসবুকে যেমন অনেক পেইজ, গ্রুপ আছে, তেমনি সেখানেও আছে । সেই vk (VKontakte, রাশিয়ান ভাষায় ВКонта́кте, মানে, InContact) সাইটে F57 নামে একটা কমিউনিটি গ্রুপ খুলে ফিলিপ বাডেকিন (Phillip Budeikin) নামের এক রাশিয়ান । F হলো তার নামের রাশিয়ান বানানের আদ্যক্ষর, আর 57 হলো তার সেই সময়কার মোবাইল নাম্বারের শেষ দুই ডিজিট । তো, এই ফিলিপ তার গ্রুপে যোগ দেয়া হতাশাগ্রস্থ মানুষকে আত্মহত্যা করতে উৎসাহিত করতো । যেন তারা নিজেদেরকে আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুত করতে পারে, তাই একটা চ্যালেঞ্জের লিস্টও বানিয়েছিল, যাতে সদস্যরা এটাতে এক ধরণের থ্রিল খুঁজে পায় এবং নিজেকে আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুত করতে পারে । তার ভাষায়, “এরা সমাজের জঞ্জাল । এদের বেঁচে থাকাটা সমাজকে অযাচিত ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই দিবে না” ! এতে কোন সদস্য যোগ দিতে বাধ্য ছিল না, চ্যালেঞ্জ পূরণ করতে বাধ্য ছিল না । তো, vk কর্তৃপক্ষ সেই গ্রুপটা ডিলিট করে দেয় এবং সে নতুন করে আবার খুলে । পরবর্তীতে, তার গ্রুপের সাবস্ক্রাইবার এবং জনপ্রিয়তা দেখে অন্য আরেকজন “মোরে কিতভ (More Kitov)” আরেকটি গ্রুপ খুলে “Sea of Whale” নামে । অর্থাৎ এদের উদ্দেশ্য ছিল পুরোটাই ব্যবসায়িক, বিতর্কিত বিষয়কে ব্যবহার করে নিজেদের পেজের ভিজিটর বাড়ানো এবং বিজ্ঞাপন পাওয়া । তারা সদ্য আত্মহত্যা করা এক নারী রিনা প্যালেনকোভার ছবিকে ব্যবহার করে নিজেদের গ্রুপের প্রচারণায় এবং তাকে একটা ডেথ কাল্টের সদস্য বলে পরিচয় করিয়ে দেয় ! অথচ, এই মেয়ের আত্মহত্যার সাথে কোন কাল্টের কোন সম্পর্কই ছিল না । এমন একজনের ছবি বা ঘটনাকে আরেকজনের নামে বা ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা সম্পর্কে আমরাতো বহুল পরিচিত। আমাদের দেশসহ অনেক দেশেই অনেক আত্মহত্যার ঘটনাকে ব্লু হোয়েল গেম খেলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে, যেটা গুজবের পালে হাওয়া দিচ্ছে আরও বেশি !

 

রিনা প্যালেনকোভা

 

৫) এই চ্যালেঞ্জের কারণে কি অনেকেই আত্মহত্যা করেছে?

উত্তরঃ এই গ্রুপটার কথা প্রথম বহুলভাবে আলোচনায় আসে নভেম্বর ২০১৫ থেকে এপ্রিল ২০১৬ এর মধ্যে আত্মহত্যা করা ১৩০ জন ছেলেমেয়ের বেশিরভাগের এই গ্রুপে সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কিত খবর প্রকাশ্যে আসার পর । তবে, তদন্তে এই গ্রুপ দ্বারা প্ররোচিত হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি । খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে গ্রুপের এডমিন ফিলিপকে গ্রেফতার করা হয় ।  এবং আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অপরাধে বর্তমানে সে জেলে আছে

 

ফিলিপ বোডেকিন (ফক্স নামেও পরিচিত অনেকের কাছে)

 

৬) এডমিন কি আপনাকে আমন্ত্রন জানাবে এটা খেলার জন্য? বা, ফোনে আপনার তথ্য হাতিয়ে নিবে?

উত্তরঃ না, আসল এডমিন নিজেই এখন জেলের ভেতর পঁচে মরছে ! এডমিন আপনাকে লিঙ্ক দিয়ে খেলতে আমন্ত্রন জানাবে না । কোন নির্দিষ্ট ফোন নাম্বার থেকে কল আসলে সেটা রিসিভ করলেই আপনি এই সম্পর্কিত সমস্যায় পড়বেন এমন কিছু না । কেউ মজা করার জন্য এমন কিছু করলে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নাই । ফেসবুকও হতাশাগ্রস্থ মানুষকে সাহায্য করার আশায় একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে । কেউ ফেসবুকে #bluewhalechallenge লিখে সার্চ দিলে প্রথমেই যে লিঙ্কটা আসে সেটাতে ক্লিক করলে মানসিক বা হতাশাসংক্রান্ত পরামর্শের একটা পেজ ওপেন হয় ।

 

ফেসবুকের সহায়তামূলক বার্তা

 

অথচ আমাদের মূলধারার পত্রিকাগুলাও সত্য মিথ্যার মিশেলে একের পর এক ভুলভাল রিপোর্ট ছাপিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই(, , ) । কারোই কিছুটা ঘেঁটে সঠিক তথ্য বের করে মানুষকে জানানোর সময় বা ইচ্ছা কোনটাই নাই। মানুষ ট্রেন্ড ফলো করতে পছন্দ করে, সেটা যেকোনো কিছুর ব্যাপারেই । কারণ এর সাথে খ্যাতি, অর্থ, প্রশংসা বা নিছক আলোচনায় আসার ব্যাপার জড়িত থাকে । ফলে মানুষজনও ট্রেন্ড ফলো করে ফেসবুকে লাইকের বা ইউটিউবে ভিউ এর আশায় লিখে বা বলে যাচ্ছে যাচ্ছেতাই, সেটা মজা করে হোক বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে হোক । এগুলোর ফলে মানুষজন আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে যাচ্ছে আরও বেশি ।

কেউ যদি আপনার সাথে এটা নিয়ে আলোচনা করে বা তার ভয়ের কথা জানায়, তাহলে তাকে সঠিক তথ্যটা জানিয়ে দিন । ভুয়া তথ্য প্রচারে নিরুৎসাহিত করুন । ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জটার মূল কারিগর যতোটা না ক্ষতি করতে পেরেছে, এটা সম্পর্কে সত্য মিথ্যা যাবতীয় তথ্য/গুজব নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে এবং সেগুলো সামাজিক মাধ্যমে বা অন্য যেকোনোভাবে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে আপনি ক্ষতি করছেন তার চেয়েও বেশি । আপনার এই ভুল জানা প্রসূত ছড়ানো একটা গুজব আরেকজনের মৃত্যুর বা অন্য কোন ক্ষতির কারণ যেন না হয়, সেটা নিশ্চিত করা আপনারই দায়িত্ব ।

2 Comments

    • উপরে ছবি এবং লিঙ্ক দুটোই দেয়া আছে । কিন্তু, সত্য মিথ্যার মিশেলে বানানো একটা বাজে ব্যাপার নিয়ে অযাচিত আগ্রহ পোষণ না করা ভালো নয় কি?

      0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *