আবরার হত্যা, ছাত্ররাজনীতি এবং বাকস্বাধীনতা

১) আবরারকে তারা পিটিয়ে মেরে ফেললো। একধাপের মারায় মরেনি সে। তিন ধাপে মারা হয়েছে তাকে, হুম তিন তিন বার। মেরেছে, মলম লাগিয়েছে,আবার মেরেছে, রাতের খাবার খাইয়েছে, এরপর আবার মেরেছে এবং একেবারে মেরেই ফেলেছে। রক্তক্ষরণে মারা যায়নি সে, মারা গেছে ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে। কতোটা কষ্ট পেয়ে মারা গেছে সে সেটা বলাই বাহুল্য। আর, কতোটা অমানবিক, পাষণ্ড মনের অধিকারী হওয়া লাগে এমন একটা কাজ করতে, সেটা আমার ভাবনার বাইরে।

Image of Abrar Fahad
ছবিঃ আবরার ফাহাদ

২) এই যে লীগের ব্যানারে কাজটা তারা করলো, ভয়ডরহীন মানসিকতা নিয়ে, এই মানসকিতা, ক্ষমতার দম্ভটা তারা পেলো কোথায়? দলীয় রাজনীতির প্রভাব, ক্ষমতার দম্ভ আর বছরের পর বছর দলীয় সিনিয়রদের আস্কারাইতো এর মূল। যেকোনো হিসাবেই আওয়ামী লীগ দল হিসাবেই এই হত্যার জন্য দায়ী হবে, যদি না তারা শুধু গ্রেফতারেই সীমাবদ্ধ না থেকে আসামীদের যথার্থ বিচারের ব্যবস্থা না করে। বিশ্বজিৎ হত্যার ক্ষেত্রে আমরা বিচারের যে উদাহরণটা পেয়েছি সেটা এই ক্ষেত্রে আমাদেরকে হতাশ করে। যারা আটক রয়েছে তাদের হয়েছে জেল, আর যারা পলাতক তাদের হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। প্রহসনের বিচার যাকে বলে আরকি!! তাই, এই আবরারের ক্ষেত্রেও গ্রেফতার দেখেই আমি আশান্বিত হই না। যথার্থ বিচার হোক, তারপর, আবরার হত্যার জন্য বিচার ব্যবস্থা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য কিনা সেটা বিবেচনা করা যাবে।

৩) বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংগঠনগুলার কাজ কি আসলে? “অমুক সময়ে তমুক করে আমরা তরায়ে ফেলছি” টাইপ নীতিবাক্য না আওড়িয়ে বর্তমান সময়ের উদাহরণ দিন। ২-৩ বছর না, ২০-৩০ বছরের উদাহরণ দিন। স্মৃতির উপর চিরুনি অভিযান চালিয়ে ২-৩ টা উদাহরণ পাওয়া গেলেও ৯৯.৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠেছে কলঙ্কিত একটা ব্যাপার। বিগত অনেকগুলা বছর এবং বর্তমান বিবেচনায় এটা বন্ধ না করার পক্ষে কোন যুক্তি আছে কি?

৪) আবরারের ক্ষেত্রে সারা দেশের সকল মানুষ যেভাবে প্রতিবাদ করেছে এটা প্রশংসাযোগ্য। আবরার কি লিখেছে, কি নিয়ে লিখেছে, সেটা কোন অজুহাতই হতে পারে না তাকে মারার জন্য। “লেখালেখির জন্য হত্যা করা উচিৎ না” কথাটা যেভাবে সবাই দ্বিধাহীন চিত্তে বলেছে সেটা প্রশংসাযোগ্য। ভালো হতো যদি কথাটা তারা সত্যিকার অর্থেই অন্তরে ধারণ করতে পারতো, আদতে যেটা হচ্ছে না, এখনো।

৫) লেখার জবাব কখনো হামলা, হুমকি, নির্যাতন হতে পারে না, সেটা যে ধরণের লেখাই হোক। আপনার খারাপ লাগছে নাকি ভালো লাগছে সেটাও এই ক্ষেত্রে ম্যাটার করে না। প্রতিটা মানুষেরই অনুভুতির জায়গা ভিন্ন ভিন্ন। কেউ ধর্মীয়ভাবে প্রচণ্ড আবেগী, কেউ তার পছন্দের রাজনৈতিক দল দিয়ে প্রচণ্ড আবেগী, আর কেউ তার পরিবার, সমাজ, দেশ বা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি(বঙ্গবন্ধু, ম্যান্ডেলা, আইন্সটাইন, হকিং) নিয়ে প্রচন্ড আবেগী হতেই পারে। কারও আবেগ এগুলার যেকোনো একটা ব্যাপারেই থাকতে পারে, আবার কারও আবেগ এগুলার একাধিক বা সবগুলা নিয়েই থাকতে পারে। কার আবেগ কোন বিষয় নিয়ে হবে সেটা অন্য কেউ জানে না, ঠিকও করে দেয়ার এখতিয়ার রাখে না। তাই, ধর্ম নিয়ে কথা বললেও অনেকে অনুভূতিতে আঘাত পেতে পারে, আবার, রাজনীতি বা দেশের সমালোচনা করলেও অনেকে তাদের অনুভূতিতে আঘাত পেতেই পারে। অনুভূতিতে আঘাতের উছিলায় আপনি যদি হামলা বা হত্যাকে জায়েজ করতে চান, তাহলে এই প্রতিটা ক্ষেত্রেই হামলা, হত্যা জায়েজ হয়ে যায়। দুনিয়ার এমন কোন উপায় কি আছে যে উপায়ে আপনি কোন কিছুর সমালোচনা করবেন বা কোন কিছু নিয়ে লিখবেন কিন্তু কেউ না কেউ সেটাতে মনে কষ্ট পাবে না?

পরিশেষে, আবরার হত্যার বিচার চাই, কঠোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। সে কি লিখছে, কি নিয়ে এবং কাকে নিয়ে লিখছে সেটা নিয়ে আলোচনাও করতে চাই না। লেখালেখির জন্য হত্যা সমর্থনযোগ্য না, কোন যুক্তিতেই না।

 

তথ্যসূত্রঃ

১) https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1674045.bdnews

২) https://bangla.bdnews24.com/campus/article1674101.bdnews

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *